আজ সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ || ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ সোমবার, ০৪:১৩ অপরাহ্ন
রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬   |   sonalisandwip.com
অধিকার বনাম নিরপেক্ষতার বিতর্ক

 ❤️ বিশেষ প্রতিবেদন - আবদুল হান্নান হীরা (চট্টগ্রাম ) ❤️ । ।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের রাজনৈতিক মত প্রকাশ ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে যখন সেই নাগরিক একজন সাংবাদিক — যাঁর পেশার মূল ভিত্তিই হলো নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরা। তাহলে কি সাংবাদিকরা রাজনীতি করতে পারবেন? নাকি পেশাগত নীতির কারণে তাঁদের জন্য আলাদা মানদণ্ড থাকা উচিত?
নাগরিক হিসেবে সাংবাদিকের অধিকার
আইন ও সংবিধানের দৃষ্টিতে সাংবাদিকও একজন সাধারণ নাগরিক।
 সাংবাদিকদের আছে —
ভোট দেওয়ার অধিকার
রাজনৈতিক মতামত রাখার অধিকার
মত প্রকাশের স্বাধীনতা
রাজনৈতিক দলে যোগদানের অধিকার
এই দিক থেকে সাংবাদিকদের রাজনীতি করা নিষিদ্ধ — এমন সরাসরি আইন অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে নেই। অর্থাৎ অধিকারগত ভাবে সাংবাদিকগণ রাজনীতি করতে পারে।
কিন্তু পেশা এখানে বড় প্রশ্ন
সাংবাদিকতা শুধুমাত্র চাকরি নয়; এটি জনআস্থার পেশা। একজন সাংবাদিকের লেখা, প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ মানুষ সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। যদি সেই সাংবাদিক প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হন, তাহলে কয়েকটি বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে—
১. নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়
রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় সাংবাদিক কোনো খবর করলে পাঠক বা দর্শক ভাবতে পারেন—
“এটা কি তথ্য, নাকি দলের পক্ষে অবস্থান?”
২. সংবাদ ও প্রচারণার সীমা ঝাপসা হয়ে যায়
সাংবাদিকতার কাজ তথ্য দেওয়া, রাজনৈতিক কর্মীর কাজ প্রচার করা। দুটো ভূমিকা এক হলে সাংবাদিকতা প্রচারণায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে
একজন নয়, একাধিক সাংবাদিক রাজনৈতিকভাবে জড়ালে পুরো প্রতিষ্ঠানকেই পক্ষপাতদুষ্ট মনে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নীতিমালায় কী বলা আছে?
বিশ্বের অনেক বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিজস্ব নীতিমালা করে রেখেছে—
সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে অংশ নিলে রিপোর্টিং থেকে সরিয়ে দেওয়া
রাজনৈতিক পদে প্রার্থী হলে সাংবাদিকতা ছাড়তে বলা
রাজনৈতিক প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ
কারণ তাঁরা মনে করে, সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অধিকার থাকলেও পেশাগত ভূমিকা সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
সমাধান কোথায়?
এখানে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা যেমন কঠোর, তেমনি পুরো স্বাধীনতাও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ভারসাম্য প্রয়োজন।
✔ সাংবাদিক ব্যক্তিগত ভাবে রাজনৈতিক মত রাখতে পারেন
✔ ভোট দিতে পারেন
✖ কিন্তু সক্রিয় দলীয় পদে থাকলে রাজনৈতিক রিপোর্টিং করা উচিত নয় তবে অন্য  বিষয় এ  রিপোর্টং করতে পারে। 
✖ নির্বাচনে প্রার্থী হলে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করা অনৈতিক
✔ স্বচ্ছতা জরুরি — স্বার্থসংঘাত থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত
মূল প্রশ্ন: সাংবাদিক আগে, না রাজনীতিক আগে?
একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুই ভূমিকায় থাকলে সংঘাত তৈরি হবেই। যদি তিনি সাংবাদিকতা বেছে নেন, তবে তাঁকে নিরপেক্ষতার দায় নিতে হবে। আর যদি রাজনীতি করেন, তবে তাঁকে রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট করে নিতে হবে।
উপসংহার
সাংবাদিকদের রাজনীতি করার অধিকার আছে — কিন্তু সেই অধিকার ব্যবহারের সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতার সংঘাত তৈরি হয়।
গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরপেক্ষতার মধ্যে সচেতন সীমারেখা টানতেই হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো —
তিনি জনগণের কাছে সত্যের প্রতিনিধি, কোনো দলের নয়।