
কলকাতার এক ঘরে জন্ম নিয়েছিল এক মেয়ে—
চোখে ছিল বইয়ের ধুলো, মনে ছিল ভাষার
ভেতর দিয়ে হাঁটার অদম্য ইচ্ছা ও সাহস।
শিক্ষা তার কাছে ডিগ্রি নয়,
ছিল প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার
করার এক অভিনব অভ্যাস।
উনিশশ’ ত্রিশের দশকের, সেই শহর
আলোকিত ছিল যুক্তির আভায়,
চায়ের কাপে তর্ক, ঘরে ঘরে দর্শনের চর্চা—
ঠিক তখনই দূর রোমানিয়া থেকে এলো
এক অরুণরাঙা তরুণ, নাম তার মির্চা এলিয়াদে—
চোখে ইউরোপের বরফ, বুকে ছিল আদিম আগুন।
সে এসেছিল গবেষণার খোঁজে, দর্শনের পাঠ নিতে
সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের কাছে। কিন্তু বইয়ের
তাকের আড়ালে ঘটল অন্য এক মধুর পাঠ—
যেখানে প্রেম নিজেকে প্রথমে বলল জ্ঞান,
পরে সেই জ্ঞান লজ্জায় ভালোলাগা হয়ে উঠল।
তাদের আবেগ ছিল না চেনা প্রেমের মতো—
ছিল চাকভাঙা মধুর মতো সরস
ও খাঁটি এবং রেশমের মতো নরম ও মসৃণ।
কিন্তু দু’জনের মাঝখানে পরিবার ও সমাজ দাঁড়িয়ে
গেল লোহার দরজা হয়ে। মেয়েটির ভেতরে
জলভরা দীঘি ছিল, কিন্তু সাঁতারের অনুমতি
ছিল না। বিচ্ছেদ এলো শান্ত পায়ে—
পরদেশি ফিরে গেলেন শূন্য হৃদয়ে।
বছর কেটে গেল। মৈত্রেয়ী বিয়ে করলেন,
সংসার হলো, কোলে সন্তান এলো, জীবন
উঠে এলো হিসাবের খাতায়।
কিন্তু দিনশেষে সে হিসাব মিললো না।
এদিকে ইউরোপে বসে মির্চা রচনা করলেন
নিজের উপাখ্যান —
রোমানিয়ান ভাষায়, প্রেমকে বানালেন কৌতূহল,
মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্পকে নিয়ে
গেলেন আঁকাবাঁকা পথে।
পরে সেই কাহিনি ফরাসি নাম নিল—
La Nuit Bengali (বাঙালি রাত)—
পশ্চিমের চোখে এক রহস্যময় পূর্ব।
আর কলকাতায় বসে মৈত্রেয়ী শব্দ দিয়ে
সযত্নে গাঁথলেন আপন গল্পের মালা—
ইংরেজিতে, যাতে পশ্চিমের মানুষ সহজে
পড়তে পারে এক বাঙালি নারীর মন। নাম দিলেন
”Na Hanyate”—
যার মানে: ”ভাঙে, তবু ধ্বংস হয় না”।
তিনি বললেন—
প্রেম ভেঙেছে, সম্পর্ক শেষ হয়েছে,
কিন্তু নারীর মন, আত্মাভিমান ও আত্মসম্মান—
”ন হন্যতে”। তারপর—
এক অলৌকিক অপরাহ্ন। সুদূর আমেরিকার
শিকাগো শহর। হ্রদের ঠান্ডা হাওয়া, আকাশে
ধাতব নীল। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে দু’জন মানুষ
মুখোমুখি থমকে দাঁড়ালেন—
যেন সময় ভুল করে জীবনের দুই আলাদা বিন্দুকে
একই লাইনে এনে বসিয়ে দিয়েছে। চুলে বয়সের
ধুলো, অন্তরে অতীতের আধা স্মৃতি। আধা ভুলো। কথা হলো—
প্রেম নিয়ে নয়, কারও কোনো অভিযোগ নেই,
কথা হলো জীবন নিয়ে—
কে কতটা বাঁচতে পেরেছেন, কে কোথায় কোথায়
নিজেকে হারতে দেননি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন—
“আমরা কি ভুল ছিলাম?” মৈত্রেয়ীর উত্তর—
“না, আমরা অসময়ে সঠিক ছিলাম।”
শিকাগোর বাতাস সেই কথোপকথন শুনে
বিদ্রুপের হাসি হাসলো, এক মুহূর্ত থেমেও গেল—
তারপর আবার চলতে শুরু করল,
যেন বুঝে গেছে—
সব প্রেমের শেষ বিচ্ছেদে নয়।
কিছু প্রেম পূর্ণতা পায় অন্যভাবে—
বহু উপহারে, বহু যুগ পরে একটি সোনালি
বিকেলে দুইটি হৃদয়ের মমতার উষ্ণতায়।
কলকাতায় ফিরে এসে মৈত্রেয়ী জানালেন—
ভালোবাসা মানে নিজেকে বিসর্জন নয়,
নিজেকে উদ্ধার করা, নিজেকে পুণর্গঠন করা।
এখন থেকে তিনি আর কোনো পুরুষের
বর্ণনার চরিত্র নন,
কারও কৌতূহলী মনের কোনো প্রশ্ন নন,
তিনি নিজেই তার জীবনের সমস্ত উত্তর।
ডিসেম্বর ১২, ২০২৫