আজ রবিবার, ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ || ২২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ রবিবার, ০৬:২৪ পূর্বাহ্ন
শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬   |   sonalisandwip.com
শৈশব স্মৃতি

II ড. মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন II

 প্রাণের অনুরণন সংযোগ নোফেল। সুন্দরবন ভ্রমণ উপলক্ষে সংযোগ নোফেলের স্মরণিকা প্রকাশের কথা শুনে শিকড়ের কথা মনে পড়ে গেল। আমার শৈশব। শৈশবের ভুলে যাওয়া স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠল। যে সুযোগ করে দিল সংযোগ নোফেল। তাদের ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যায় না। হারিয়ে যাওয়া শৈশব নিয়ে আমার লেখা।   ১৯৬২ সালের ১ জুন নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম হাজীপুরে আমার জন্ম। চার বছর বয়সেই বাবা আমাকে, বড় ভাই ফারুক ও কাজিন তাহেরকে হাজীপুর গ্রামের হাজীপুর এ এম সরকারি প্রাথমিক বিদ‍্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করান। কাজিন তাহের ও আমি সমবয়সী ছিলাম।

 আমাদের জন্য গৃহশিক্ষক ছিলেন। তিনি থাকতেন কাচারিঘরে। তখন যোগাযোগব‍্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। শুকনো মৌসুমে হাঁটা আর বর্ষাকালে নৌকা ছিল একমাত্র বাহন । বর্ষাকালে আমরা নৌকায় স্কুলে যেতাম। তখন আমাদের স্বপ্নের শহর চৌমুহনীতে আমরা নৌকায় যাতায়াত করতাম। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। কাচারিঘরে হারিকেন ও কুপি বাতি বা চেরাগের আলোয় পড়াশোনা করতাম।
সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর আমি, বড় ভাই ফারুক ও তাহের কাচারিঘরে থাকা শুরু করি। তখন কাচারিঘর ছিল আমাদের প্রত‍্যহিক জীবনে অন‍্যতম অনুষঙ্গ।

  এখন কাচারিঘর, হারিকেন, কুপি বাতি ও গৃহশিক্ষক ঐতিহ্য বিলুপ্তপ্রায়।
নোয়াখালীর আরেকটি ঐতিহ‍্য ছিল নানান স্বাদের পিঠাপায়েসের প্রাচুর্য । আমি কাচারিঘর, হারিকেন ও নোয়াখালীর ঐতিহ্য পিঠা নিয়ে কিছু আলোচনা করবো।

হারিকেনঃ
হারিকেন’ নামটা শোনামাত্র অনেকের অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীকগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যুৎবিহীন গ্রামের অন্ধকার দূর করার একমাত্র অবলম্বন ছিল হারিকেনের আলো।
 লেখক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাক হরকরা গল্পে আমরা ডাকপিয়নের লন্ঠন বা হারিকেন নিয়ে ছোটার কাহিনি পেয়েছি। এখনো গ্রামের কিছু বাড়িতে হারিকেন পাওয়া যেতে পারে, সেগুলো হয়তো ময়লা ও মরচে পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
 দশম শ্রেণি পর্যন্ত হারিকেনের আলোয় দিয়ে লেখাপড়া করেছি।  কালের বিবর্তনে সেই হারিকেন আজ বিলুপ্তির পথে।

কাচারি
একসময় গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই ছিল কাচারিঘর। এই কাচারিঘর ছিল গ্রামবাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অংশ। কালের বিবর্তনে এই কাচারিঘর সংস্কৃতি যেন হারিয়েই যাচ্ছে।আমাদের বাড়ীতেও একটি কাচারী ঘর ছিল। আমি পন্ছম শ্রেণীতে উঠার পরেই বড় ভাই ফারুকের সাথে কাচারী ঘরে থাকা শুরু করি।আমরা এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত কাচারী ঘরেই ছিলাম।পরে চৌমুহনী এস এ কলেজে ভর্তি হলে চৌমুহনী থাকা শুরু করি।
     আমাদের কাচারী ঘরে লজিং মাস্টার থাকতেন, তাঁর কাছে আমরা সকাল - সন্ধ্যা লেখা পড়া করতাম। লজিং মাস্টার হিসেবে পেয়েছিলাম দেলোয়ার স‍্যার, হক স‍্যার, নুরুল ইসলাম স‍্যার ও হাবিব স‍্যার। এর মধ্যে সবচেয়ে কড়া ছিলেন হক স‍্যার এবং উত্তম মানের শিক্ষক ও  প্রশাসক ছিলেন । এটি ১৯৭২ সালের ঘটনা দশম শ্রেণীর ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র ছিলেন। তাঁরা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ, তরিক উন‍্যা দিন্আনা, আলী ও এমদাদ।বিদ‍্যলয়ে ক্লাস শুরুর পূর্বে এসেম্বলি হতো, সকল ছাত্রছাত্রী মাঠে দাঁড়াতো এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হতে। মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের দাবি ছিল শিক্ষকগণও মাঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় মাঠে উপস্থিত থাকবেন।প্রধান শিক্ষক হক স‍্যার ঠিক আছে আমরা স্কুল ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতে অংশগ্রহণ করবো। মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের দাবী ছিল মাঠে এসে শিক্ষকদের জাতীয় সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করতে হবে। এর ফলে হক স‍্যার উত্তেজিত রুম থেকে এনে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের আচ্ছামত বেত্রাঘাত করলেন। তখন মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রগণ উত্তেজিত হয়ে হক স‍্যারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়া শুরু করলেন। হক স‍্যারকে অপসারন করা না হলে সকল ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিলেন। আমরা মাত্র ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। বিদ্যালয় এক বিশ্রৃখল পরিবেশের উদ্ভব হলে। আমার বাবা তখন মা‍্যনেদিং কমিটির সভাপতি। উনিসহ বিদ‍্যালয় মযন্জিং কমিটি সদস‍্য সফিউল‍্যা মাস্টার, হানিফ সাহেব ও যশোদা বাবু এলেন। উনারা শিক্ষক ও ছাত্রদের সাথে কথা বললেন।উনারা ছাত্রদের অনুরোধ করলেন হেড মাস্টার সাহেব দুঃখ প্রকাশ করবেন তোমরা ক্লাসে ফিরে যাও। তখন রক্ত গরম মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রদের দাবি একটাই হেড মাস্টার স‍্যারকে পদত‍্যাগ করতেই হবে । প্রায় তিন ঘন্টা পর হেড মাস্টার হক স‍্যার স্কুলের বারান্দায় এসে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন “ আজ থেকে এই স্কুলের হেডমাস্টার পদ থেকে আমি ইস্তফা দিলাম এবং আজকেই আমি স্কুল থেকে বিদায় নেবো” । আমরা হারালাম এক নিবেদিত প্রধানশিক্ষক। এরপর ছাত্ররা ক্লাসে ফিরে এল। হক স‍্যার অশ্রুসজল নয়নে স্কুল থেকে বিদায় নিয়ে পরদিন আমাদের বাড়ী থেকে  তাঁর নিজ বাড়ী কুমিল্লায় চলে গেলেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে হক স‍্যারের কথা আজও আমার মনে পড়ে।
গেস্টরুম বা ড্রয়িং রুম আদি ভার্সন কাচারিঘর এখন আর গ্রামীণ জনপদেও দেখা যায় না। মূল বাড়ি থেকে একটু বাইরে আলাদা খোলামেলা ঘর। অতিথি, পথচারী কিংবা সাক্ষাৎপ্রার্থী এই ঘরে এসে বসেন। প্রয়োজনে এক-দুই রাত যাপনেরও ব্যবস্থা থাকত কাচারিঘরে।

কাচারিঘর ছিল বাংলার অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের আভিজাত্যের প্রতীক।  বর্ষাকালে কাচারি ঘরে বসে পুঁথিপাঠ, শায়ের বা কবিতা শুনে মুগ্ধ হতেন শ্রোতা।
পূর্বপুরুষদের নানান স্মৃতিবিজড়িত এই কাচারিঘর সত্যিই প্রাচীনতার বার্তা বহন করে।


নোয়াখালীর পিঠা

নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী পিঠার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো খোলাজালি পিঠা (বা খোলাজা পিঠা) এবং ম্যারা পিঠা (যাকে দৌল্লা পিঠা বা ছাইন্না পিঠাও বলা হয়)। এ ছাড়া পানতোয়া পিঠাও নোয়াখালীর একটি জনপ্রিয় পিঠা। আরও আছে নারিকেল পিঠা, পুয়া বা তেলের পিঠা, তালের পিঠা, ভাপা পিঠা, নকশি পিঠা ও জাল্লাডু ( মুড়ি গুডা ও গুড় দিয়ে তৈরি) ইত‍্যাদি।
খোলাজালি পিঠা
এটি চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি একটি সুপরিচিত বাঙালি পিঠা।
ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে এই পিঠা খুব জনপ্রিয়।
এটি সাধারণত ঘন খেজুরের রস ও নারিকেল দিয়ে খেতে খুব মজা। এ ছাড়াও মুরগি, গরুর মাংসের সাথে পরিবেশন করা হয়।
ম্যারা পিঠা (দৌল্লা পিঠা/ছাইন্না পিঠা)
এটি নোয়াখালী অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী পিঠা, যা চালের গুঁড়া ও গুড়/ঘন খেজুরের রস  দিয়ে তৈরি করা হয়।
এই পিঠাটি গুড় ছাড়া তৈরি করে ভর্তা বা গরুর মাংসের সাথে খাওয়া হয়।
পানতোয়া পিঠা
নোয়াখালীর একটি ঐতিহ্যবাহী এবং বিখ্যাত পিঠা।
এই পিঠাটি ডিম ব্যবহার করেও তৈরি করা হয়, যা ডিম সুন্দরী পিঠা নামেও পরিচিত হতে পারে।