
ড. মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন :: প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু এই সম্পর্ককে যিনি সেবা, মমতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে এক অনন্য ও মহিমান্বিত উচ্চতায় উন্নীত করেছেন, তিনি হলেন বন্যপ্রাণীর পরম বন্ধু জনাব সিতেশ রঞ্জন দেব। ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার জেলার চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে তাঁর জন্ম। জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন একজন সৌখিন পশু-পাখি শিকারি। আর সেই শিকারি থেকেই সেবকে রূপান্তরিত হওয়ার মহৎ যাত্রা তাঁকে পরিণত করেছে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে।
শিকারি থেকে সেবকে রূপান্তর
ছোটবেলা থেকেই তিনি বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি শিকার করতেন। অরণ্যের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো, পাখির কলতান শোনা আর বন্যপ্রাণীর বিচিত্র জীবনাচরণ তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করত। মূলত ১৯৬৫ সাল থেকেই প্রাণী জগতের প্রতি তাঁর এক দুর্বার আকর্ষণ জন্মে। তবে শিকারের নেশার মধ্যেই একদিন এক আহত প্রাণীর করুণ আর্তনাদ তাঁর ভেতরের সুপ্ত মানবতাবোধকে জাগিয়ে তোলে। সেই মুহূর্ত থেকেই শিকারি সিতেশ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বন্যপ্রাণীর পরম সেবক ও পরম বন্ধু।
সেবা আশ্রম প্রতিষ্ঠা - এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ
এই গভীর উপলব্ধি থেকেই ১৯৭২ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে ও একক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘বন্যপ্রাণী সেবা আশ্রম’। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ঝড়-তুফান, বন্যা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহত পশু-পাখিদের তিনি নিজ হাতে তুলে এনে পরম যত্নে সেবা-শুশ্রূষা দিতে শুরু করেন। সুস্থ করে তুলে আবার তাদের বনে অবমুক্ত করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। অল্প দিনেই এই আশ্রম অসহায়, আশ্রয়হীন ও আহত পশু-পাখির জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও ভরসার ঠিকানায় পরিণত হয়। এক পর্যায়ে তিনি সকল প্রাণীর আশা-ভরসার একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে সর্বজন পরিচিতি লাভ করেন।
ফাউন্ডেশন গঠন ও প্রাণী বৈচিত্র্যের অপূর্ব সমাহার
তাঁর এই মহৎ কর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী রূপ দিতে তিনি ২০১১ সালে ‘বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’ নামে রেজিস্ট্রেশন করেন। বর্তমানে এই ফাউন্ডেশনের ছায়াতলে বহু বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির পশু-পাখির আশ্রয় হয়েছে। এখানে রয়েছে ভালুক, গন্ধগোকুল, লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, সোনালী বানর, কালোমুখ হনুমান, শজারু, কচ্ছপ, অজগর, গোখরা, মেছোবাঘ, বাঘডাশ, হরিণ, মায়া হরিণ, শকুন, ময়না, কবুতর,জল-কবুতর, ঘুঘু, কাকাতুয়া, টিয়া সহ অসংখ্য প্রজাতির এক অপূর্ব সমাহার। এখানে আহত ও অসুস্থ পশু-পাখির নিয়মিত চিকিৎসা, পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের পর সুস্থ হলেই তাদের পরম মমতায় প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
আমার স্মৃতিতে শিতেশ বাবু
আমি এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথম পরিদর্শন করি ২০১৩ সালের মার্চ মাসে। তখন আমি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে উপসচিব এবং মন্ত্রী মহোদয়ের একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আমি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র ছিলাম, তাই প্রকৃতি, পরিবেশ ও পশু-পাখির প্রতি আমার এক অন্যরকম দরদ ও টান ছিল। সেদিনই শিতেশ বাবুর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তিনি আমাকে প্রতিষ্ঠানের তীব্র আর্থিক সংকট এবং এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
পরবর্তীতে আমার স্ত্রী সৈয়দা শারমিন, আমার সন্তান সালিম সাদমান সময় ও শাকির আদনান প্রত্যয়কে নিয়ে আমি একাধিকবার এই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছি। আমার শ্যালক নিপুণ, তাঁর স্ত্রী চৈতী ও সন্তান ইয়াসিন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে বাংলাদেশে এলে তাদের নিয়ে আমার পরিবারের সদস্যসহ প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করি। আমি প্রায় ৭/৮ বার এটি পরিদর্শন করেছি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আমি শ্রীমঙ্গলের এই সেবা ফাউন্ডেশন পরিদর্শন করি।
প্রথম ২০১৩ সালে পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফিরে আমি মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে তাঁর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক বরাদ্দের অনুরোধ করি। তিনি বলেন, এ ঐচ্ছিক তহবিলের সরকারি বরাদ্দ শুধু নোয়াখালীর জন্য নয়, সারা দেশের চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দিতে হবে। তখন ঐচ্ছিক তহবিলের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ৫ লক্ষ টাকা। প্রথম বছর উক্ত বরাদ্দ থেকে ২৫,০০০/- টাকা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে সরকার এই বরাদ্দ ১০ লক্ষ টাকায় উন্নীত করেন।প্রতি বছর মন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে এ প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক বরাদ্দ দিতাম।
২০১৯ সালে আমি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে যোগদান করি, সেখানে সচিবের বছরে ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার একটি ফান্ড ছিল। সেখান থেকেও আমি এই সেবা ফাউন্ডেশনে আর্থিক বরাদ্দ প্রদান করেছি। পরবর্তীতে সেতু বিভাগে সচিব হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন প্রতি বছরই আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছি। আমি কর্মরত থাকাকালীন ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর সহায়তা অব্যাহত রেখেছিলাম এবং ২০২২ সাল থেকে আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সামান্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।
অপূরণীয় শূন্যতা ও বিনীত আহ্বান
এই নিরলস পাখি-প্রেমিক, প্রাণী-সেবক ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই ৭৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মহাপ্রয়াণে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হবার নয়।
বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই সেবাধর্মী ফাউন্ডেশনটি তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। প্রতিষ্ঠাতার অবর্তমানে এর কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাই এই মানবিক ও প্রকৃতিবান্ধব প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে সদাশয় সরকার, বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ এবং সকল পশু-পাখি প্রেমিক ও প্রকৃতিবিদের আন্তরিক সহযোগিতা ও আর্থিক সহায়তা একান্তভাবে কাম্য।
আমি সকলের নিকট বিনীত প্রত্যাশা করি, সিতেশ রঞ্জন দেবের এই মহৎ স্বপ্ন ও সেবার আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা সকলে এগিয়ে আসব। তাঁর দেখানো আলোর পথেই গড়ে উঠবে মানুষ ও প্রকৃতির এক সুন্দর ও শান্তিময় সহাবস্থান।
-
লেখকঃ ড. মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন
সাবেক সচিব
সেতু বিভাগ
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়