আজ মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬ || ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার, ০৭:৪৯ অপরাহ্ন
মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬   |   sonalisandwip.com
পুলিশকে ভালো কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, অত:পর পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা

II কাজী আনোয়ার হোসেন II

পুলিশ( police)  শব্দটির বিশ্লেষণ করলে যা আসে polite, obedient, loyal, intelligent, courageous, efficient, পুলিশ শব্দটি noun হলেও এর শাব্দিক অর্থ দাড়াঁয় শৃঙ্খলা, শান্তি,ও আইন রক্ষা করার ব্যবস্থা। সুতরাং পুলিশ বলতে বুঝায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর সদস্য যাদের দায়িত্ব বা কর্তব্য হচ্ছে দুর্নীতি দমন,  প্রতিহত করা বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার সুব্যবস্থা নিশ্চিত  করা। এই বাহিনীর মূলনীতি হল শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও প্রগতি বজায় রাখা। এর মূল মন্ত্র দুষ্টের দমন,  শিষ্টের লালন।  

রোম সম্রাট বিশ্বের অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষায় সর্বপ্রথম পুলিশবাহিনী গঠন করেন। সম্রাট আকবর বঙ্গ ভারত উপমহাদেশে প্রথম পুলিশ বাহিনী গঠন করেন। ১৮৬০ সালের দিকে অবিভক্ত বাংলায় পুলিশ কমিশন গঠন এবং  ১৮৬১ দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে পুলিশ সার্ভিস কমিশন কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যে কয়েকটি পেশাজীবী গোষ্ঠী রয়েছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীও একটি অন্যতম বাহিনী। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর  একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রে পুলিশ অত্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী স্বীকৃতি লাভ করে এবং  এর প্রশাসনিক যাত্রা শুরু হয়।  

একটি রাষ্ট্রকে সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল রাখতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম। নাগরিককে সার্বিকভাবে নিরাপত্তা  দিতে  পুলিশ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।  একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাই রাষ্ট্র  স্বাভাবিক ভাবে নাগরিকদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক সময় ভালো কাজের পাশাপাশি খারাপ বা মন্দ কাজে লিপ্ত হতে দেখা যায়। যা একটি সুষ্ঠু বা গণতান্ত্রিক  রাষ্ট্রের জন্য কখনো সুখকর নয়।  পুলিশকে ভালো কাজ সুযোগ দিতে হবে। পুলিশ যদি ভালো কাজের সুযোগ পায় দেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে। একটি সমৃদ্ধি ও শক্তিশালী গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পুলিশ হোক জনগণের বন্ধু। পুলিশ কারো আজ্ঞাবহ না হয়ে জনগণের জন্য চিন্তা করার পথ সুযোগ দিন।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার রাষ্ট্রীয় এই বাহিনীকে নিজের মত করে ব্যবহার করতে দেখা গেছে । ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতনভাতা  পেয়েও রাষ্ট্রীয় পলিসী তথা রাজনীতিবিদদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকতে অনেকটা অনিয়ম করতে বাধ্য হয় এবং সাধারণ জনগনের নিরাপত্তার বাহিরে গিয়েও কাজ করতে দেখা গেছে।

২০২৪-এ ৫ আগষ্টের সময়ে একটা বাহিনীর করুন পরাজয় দেখেছে বাঙালি জাতি। কি নির্মম দৃশ্য ছিল যা বলা বাহুল্য। আমরা যারা টিভির  পর্দায় বা সামাজিক যোগাযোগের দর্শক গ্যালারিতে ছিলাম তখন এমন নির্মম দৃশ্য বাঙালি জাতি ভাবিয়ে তুলছে। যদিও তখনকার সময়ের পরিপ্রেক্ষিত পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ! এই দেশের শান্তিকামী জনগণ, রাষ্ট্রীয় বেতনভাতাভুক্ত একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর  কাছে থেকে  এই দেশের শান্তিকামী জনগণ এমন প্রত্যাশা কখনো করেন নিই। একটা ফ্যাসিজমবাদী রাজনৈতিক দলের কমান্ড শুনতে বা পালন করতে গিয়ে বা ফ্যাসিজমবাদী রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় টিকে রাখতে  এমন চলাচিত্রকারের মতো দৃশ্যয়ান হতভাগা জাতি হিসেবে উপলব্ধি করতে  হয়েছে। যা ছিল লজ্জাস্কর। বিবেক বহির্ভূত।  

আমরা, আমাদের ইন্টিরিম সরকার থাকাকালীন  সময়ে অনকে কিছু শিখতে  পেরেছি।  পুলিশ একটিভ ছিল না বিধায় মব ভায়োলেন্স সৃষ্টি হয়েছে । এক একটা দিন, এক একটা সময় বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে রাষ্ট্রের  পরিবেশ নষ্ট করেছে।  উদ্ভেগ, উৎকুন্ঠার মাধ্যমে সাধারণ জনগণ জীবনযাপন করতে হয়েছে। প্রতিদিন, প্রতিটি মূহুর্ত ছিল একটি এক, একটি অশান্তির পরিবেশ।  অতীতেও পুলিশ রাজনৈতিক ভাবে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলের নতজানু করার ফলে ২৪ নামক গণতন্ত্র রক্ষার ইতিহাস তৈরী হয়েছে। কোটা বিরোধী আন্দোলনে, মানুষের ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনতে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে।  পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে।  একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর মনোবল হারিয়ে গেছে৷ ২৪ এর গণঅভ্যূস্থানে আমরা আমাদের অনেক পুলিশ বাহিনীকে হারিয়েছি।  যা কখনো কারো কাম্য ছিল না। কত মা হারিয়েছে তার কলিজার সন্তানকে, কত স্ত্রী হারিয়েছে প্রিয়তমা স্বামীকে, সন্তান হারিয়েছে প্রিয় বাবাকে,  দেশ হারিয়েছে প্রশিক্ষিত পুলিশকে। 

পুলিশ একটি রাষ্ট্রের বেতনভোগী প্রশিক্ষিত বাহিনী।  রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের  নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আবশ্যক।  সাধারণ জনগণ যেন নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারে তা পুলিশকে নিশ্চিত করতে হবে।  দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের মুখ্য ভূমিকা। জননিরাপত্তা স্বার্থে রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য। দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে দেশের দুষ্ট ও ক্ষতিকর লোকগুলি আইনের আওতায় আনা পুলিশের দায়িত্ব।  দেশের আইন শৃঙ্খলা বিঘ্ন না হয় সেই বিষয়ও সজাগ থাকা একটি সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীর কাজ।

 দীর্ঘ ১ বছর খানেক একটি অনিশ্চিত, অনিশ্চয়তার মাধ্যমে আমরা অতিবাহিত করেছি ।  মাত্র গেল কয়েক দিক আগে পুলিশ জনগনের নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা দিতে এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনে,  নিজেকে তৈরী করার চিন্তাভাবনা, মনস্তাত্ত্বিক ভাবে তৈরী হয়েছে যা আমরা সামাজিক যোগাযোগের বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি।  যারা ক্ষমতার প্রভাব দেখান তারা সুষ্ঠু  রাজনৈতিক দলের সুবিধাবাদী, এরা ক্ষনিকের অতিথি । এরা সব সময় রাজনৈতিক দলকে ব্যবহার করে ফায়দা লুঠে। এরা কখনো দেশের এবং জনগনের ভালো চায় না। 

সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দলকে বিপদগ্রস্ত করেন।  দেশ থেকে এবং দেশের মানুষকে জিম্মি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে বিদেশের মাটিতে পাড়িজমান এবং বেগম পাড়ায় বাড়ী, গাড়ী গড়ে তোলেন। একটি সুষ্ঠু গ্রহণ যোগ্য রাজনৈতিক দল এই সব অপকর্ম কখনো পছন্দ করেন না। যারা এই সব অপকর্ম লিপ্ত তারা সত্যিকার অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন না। এরা সব সময় সুবিধাবাদী। যে দল ক্ষমতায় আসে, সে দলের সাথে মিশে, কিংবা একটু মিটিং মিছিল করে, অথবা নেতার সাথে ছবি তোলে এবং রাজনৈতিক দলের ক্ষতি করে। এরা সব সময় সুযোগ সন্ধানী। এরা মূলত ভাসমান প্রজাতি। সমাজে যত অপকর্ম আছে এরা করে থাকে। এরা দলীয় ট্যাগ ব্যবহার করে ফায়দা লুটায়। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। রাজনৈতিক  দলের ক্ষতি করে। সময়ে সময়ে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে  অবৈধভাবে আর্থিক ভাবে লাভবান হন। নিদিষ্ট সময় শেষে এরা হারিয়ে যায়।  যারা দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, দলের মঙ্গল কামনা করে এরা কখনো হারিয়ে যায় না। এরা সাধারণ জনগনের হৃদয়ে বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ।

একটি শক্তিশালী গ্রহণ যোগ্য রাজনৈতিক দল একটি উন্নত রাষ্ট্রের  মূলভিত্তি, চাবিকাটি ।  একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল যে কোনো দেশের গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে।  দেশের জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে পারে৷  একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক দল সমাজ ও দেশ উন্নয়নের দর্পন। একটি সমাজ, দেশ উন্নয়নে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের তুলনা হয় না। সমাজ উন্নয়ন হলে  দেশ এগিয়ে যাবে।  সামাজিক রীতিনীতি, শান্তি শৃঙ্খলা রাজনৈতিক দলের উপর বর্তায় এবং রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক দল  গণতান্ত্রিক ভাবধারা উন্নয়নে সাধারন মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক। অথচ আজকাল আমরা বিপরীত অংশটা দেখতে পাই। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে  রাজনৈতিক দলগুলি শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। যা দেশ, দশের ও রাজনৈতিক  দলের জন্য মঙ্গলজনক। 

লেখক : কাজী আনোয়ার হোসেন,  রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী , সভাপতি সন্দ্বীপ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক পরিষদ, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম।  তাং ০১.০৫.২০২৬।