.✍️ এস এম জাকিরুল আলম মেহেদী
প্রস্তাবনা
জীবনের পথে কিছু মানুষ থাকে,
যাদের ছায়ায় বেড়ে ওঠে স্বপ্ন,
যাদের স্নেহে জাগে জ্ঞানের আলো,
তারা চলে গেলে.....
সময় থেমে যায়, স্মৃতি কাঁদে নীরবে…
মানুষের জীবনে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন, যারা আমাদের শুধু শিক্ষিতই করেন না,আমাদের চরিত্র, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের ভেতরেও গভীর ছাপ রেখে যান। আমার কলেজ জীবনের এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন প্রফেসর আবুল বাশার স্যার। সম্প্রতি স্যার আমেরিকায় মেয়ের বাসায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)। স্যারের মৃত্যু সংবাদ শুনে মনে হলো আমার জীবনের একটি সোনালি অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
প্রথম পরিচয়
ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের প্রথম দিন। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্লাসে প্রথমবার স্যারকে দেখি। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, শান্ত অথচ দৃঢ় দৃষ্টি, হাতে চক। বোর্ডে লিখলেন......
"মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়। "
প্রথম লেকচারেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, এই মানুষটির কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবই নয়, জীবনেরও পাঠ পাওয়া যাবে।
ক্লাসরুমের স্মৃতি
আমার সাথে সেই ক্লাসে পড়ত আমার ছোট বোন (কাজিন) লুবনা। আমরা দুজনেই স্যারের লেকচারগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতাম।
একদিন স্যার আব্বাসীয় যুগের সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বাগদাদের জ্ঞানচর্চা, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন ও শিল্পকলার সমৃদ্ধি নিয়ে তিনি এমনভাবে বলছিলেন যে মনে হচ্ছিল আমরা সেই সময়ের মধ্যে বসবাস করছি। লুবনা কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় বলল...
মধু ভাইয়া "দেখছেন? স্যার যখন বলেন, মনে হয় আমরা সত্যিই বাগদাদে আছি।"
আমি মজা করে বললাম...
"হয়তো কাল সকালেই হারুনুর রশিদের দরবারে হাজির হবো!"
লুবনা মুচকি হেসে বলল..
আমরা যদি মন দিয়ে পড়ি, বইয়ের ভেতরেই সময়ের সেতু খুঁজে পাবো!লুবনা খুবই মেধাবী ও মনোযোগী ছিলো, আর আমি ফাঁকিবাজ ছিলাম।
এমন প্রাণবন্ত পরিবেশে ইতিহাস শেখা ছিল আনন্দের এক নতুন অভিজ্ঞতা।
শিক্ষকের স্নেহ ও দর্শন
স্যারের কণ্ঠে ছিল এক আশ্চর্য টান মৃদু অথচ দৃঢ়। তিনি শুধু পড়াতেন না, আমাদের শেখাতেন কীভাবে শিখতে হয়। বারবার বলতেন,
"পড়াশোনা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবন গড়ার জন্য করো।"
যখন কোনো ছাত্র পিছিয়ে পড়ত, তিনি ধমক না দিয়ে বলতেন-
"তুমি আমার ছাত্র, তুমি পারবেই শুধু চেষ্টা চালিয়ে যাও।"
তার এই আশ্বাসই আমাদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলত।
সময় বদলেছে, স্মৃতি বদলায়নি
আজ আমার ছেলে-মেয়েরা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে শিক্ষার ধরন, কিন্তু আমি আজও ভুলতে পারিনি সেই মহান গুরুর পাঠ। স্যারের স্নেহ, দিকনির্দেশনা, মানবিকতা সবই আজও হৃদয়ের গভীরে অম্লান।
সমাপ্তি..
প্রফেসর আবুল বাশার স্যার হয়তো শারীরিকভাবে আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার আদর্শ, নৈতিকতা ও জ্ঞানের আলো আমাদের ভেতরে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
হে আল্লাহ,
এই মহৎ শিক্ষকের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন,
তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চতম স্থানে স্থান দিন,
তার জীবনভর ছড়িয়ে দেওয়া জ্ঞানের আলো যেন চিরকাল মানবতার জন্য জারি থাকে…
-
এস এম জাকিরুল আলম মেহেদী- সাবেক শিক্ষার্থী, সরকারি হাজী এবি কলেজ, সন্দ্বীপ।