
মানব শিশু পৃথিবীতে আগমনের , সাথে সাথে প্রথমে যেটা প্রয়োজন হয়, তার নাম হলো সেবা। আর সেবার প্রয়োজন হয় না, এমন কোন মানব নেয়। এমনকি মৃত্যুর পরও মানব জীবনে, সেবার প্রয়োজন হয়। দাফন, পোড়ানো বা করা হয়।
জড় বস্তুর ও সেবার প্রয়োজন হয়। না হয় সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে।
এরপর দরকার হয় জীবনের, অন্যান্য চাহিদা। যেমন অন্য বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা। সুতরাং সদ্য শিশুর নিরাপদ বেঁচে থাকা, নির্ভর করে নিরাপদ প্রসবের মাধ্যমে। আর আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে এখনো আধুনিকতর ছোঁয়া লাগেনি,সেখানে এই কাজগুলো, বেশির ভাগ করে মিডওয়াফই বা ধাত্রী।
দেশের আনাচে কানাচে এখন ও ঠিক মতো হাসপাতাল নেই,ডাক্তার নেই,নার্স নেই। সেই সমন্ত জায়গায় অতীতের ডাক হরকরাদের মতো পৌঁছে যায় মিডওয়াফই।
রোদ বৃষ্টি ঝড তুফান কোনটায় তার চলার পথে, বাধা হতে পারে না। কখনো কখনো ছোট ছাতার আড়ালে, নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করেন।
কিন্ত কতোক্ষন লুকাতে পারেন?
সুন্দর - অসুন্দর হাসি- কান্না সাথে, ঝড়- তুফানের এই পথ চলা চলতে থাকে, জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত।
সালমা আক্তার একজন দক্ষ মিডওয়াফাই।
বাবার নাম আমিনুল ইসলাম। তিনি ছিলেন একজন অখ্যাত মুক্তিযুদ্ধো।ইতিহাসে বইয়ের পাতায়, তার নাম লেখা হয়নি। পাননি কোন সম্মান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, কেটেছে চরম দুঃখ কষ্ট আর দারিদ্রতায়। সাথে ছিল হতাশা। না পেয়েছেন ঠিকমত অন্ন বস্র।আর না পেয়েছেন রোগ ব্যাধিতে চিকিৎসা। জীবিত বাবার পাশে, দাঁড়ানো ক্ষমতা সালমার ছিল না। কারণ তখন সেই ছোট। আজ বাবা বেঁচে থাকলে অন্তত একবেলা মনের মত করে খাওয়াতে পারতো। এই দুঃখ সারা জীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হবে।
স্বাধীনতার দশ বছরের মাথায়, বাবা না ফেরার দেশে চলে যায়। অবশ্য মৃত্যুর পূর্বে তাদের প্রতি, গুরু দায়িত্ব পালন করে যায়। অর্থাৎ সালমা ও তার ছোট বোন রাবি কে বিয়ে দিয়ে যায়। সালমার একমাত্র বড় ভাই ইমরান। তাই বাবার তাকে নিয়ে, তেমন চিন্তা করতে হয় নাই।
সালমা মাঝে মাঝে রাতে, দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবাকে খোঁজে। বর্ষায় টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটায়, বাবা তাকে হাতছানি দেয়।
এই দেশ জাতি বাবাকে কোন সম্মান দেয়নি। তার জন্য বাবার কোনো দুঃখ ছিল না। তিনি বলতেন বিনিময় থাকলে ত্যাগের আনন্দ থাকে না। বাংলার কোটিকোটি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে, সবুজ ঘাসের নিচে মাটির বিছানায়, চিরনিদ্রায় শায়িত তার বাবা। এর থেকে বড় পাওয়ার কি থাকতে পারে? কয়জনেই তা পায় ?
২০ বছর বয়সে সালমার বিয়ে হয়। স্বামীর নাম হায়দার রশিদ। ছোট ব্যবসা করে। টানা পূরণের সংসার। তবুও সালমা সুখী। এরপরও ভাবনা মাঝে মাঝে তাকে তাড়া করে । আস্তে আস্তে সংসার বড় হবে। তখন এই রোজকারের সংসার চলবে? না তাকে কিছু একটা করতেই হবে । এতে যদি সংসারের সামান্য সচ্ছলতা আসে।
এর মাঝে সালমার কোল আলো করে, দুটো ছেলের জন্ম হয়। অনভিজ্ঞ দাইয়র কারণে, তার জরায়ু কিছুটা স্থানচ্যুত হয়। এতে মাঝে মধ্যে সমস্যা হয়।
এভাবে জীবন যুদ্ধ চলতে থাকে। ছেলেরা বড় হতে থাকে।
এমন সময় একদিন খবর আসে, তার ছোট বোন রাবি খুব অসুস্থ। কেননা রাবির বাচ্চা প্রসবের সময় হয়েছে। তার শ্বশুরবাড়ি দীপঞ্চালে। নৌকায় একমাত্র বাহন। বর্ষায় নদী হয়ে যায়, আরো উত্তাল মাতাল। নৌকা করে থানা সদরে, আসতে খরচ বেশি হয়। তাই এই যাতায়াতে অনেকের অনীহা। তখন অনভিজ্ঞ ধাত্রী একমাত্র ভরসা। এতে জীবন না বাচঁলেও টাকা বাঁচে।
রাবির জন্য ধাত্রী আনা হয়। ধাত্রীর অনভিজ্ঞ হাত বাচ্চাটাকে, পেটের মধ্যে মেরে ফেলে। আবার বাচ্চার জন্মের পর কিছুতেই ফুল পড়ছিল না। ধাত্রী হাত দিয়ে ফুল ছিঁড়ে আনে। মুহূর্তে রক্তে ভেসে যায়, মাটিতে পাতানো বিছানা। পৃথিবী কে চির বিদায় জানায়, সালমার একমাত্র বোন।
এমনি করে প্রতিনিয়ত বাংলার, আনাচে-কানাচে ঝরে যায়, অনেক নাম না জানা সদ্য মা কুঁড়িরা। রাবির মূত্য সালমাকে যেমন যন্ত্রনা দেয়, তেমনি ভাবিয়ে তুলে। বর্তমান পৃথিবী যেখানে এতো এগিয়ে, সেখানে আমাদের দেশে এখনো এতো করুন মৃত্যু?
সালমা অনেক ভাবে। আর কিছু টাকা সঞ্চয় করে। আবার বাবার দেওয়া সামান্য গয়না বিক্রি করে, মিডওয়াইফের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য শহরে রওনা হয়।
তারপর ট্রেনিং নিয়ে, সার্টিফিকেট নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে । শুরু হয় সালমার নতুন আরেক জীবন। দিন যেতে থাকে।ঝড়, বৃষ্টি, রোদ কিছুই তার চলার পথে থমকে দাঁড়ায় না। সালমা নতুন নতুন উদ্যম গতিতে ছুটে চলে। অনেক সময় নাওয়া খাওয়া ভুলে যায়। কখনো ডেলিভারি করেন । আবার কখনো চেকআপে যান। সদ্য গর্ভবতী হওয়া মাকে নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দেন। সময়মতো টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই কঠিন চলার পথে, দীর্ঘ সময় হাঁটেন। কখনো পাকা রাস্তা, কখনো কাঁচা রাস্তা, আবার কখনো ধানের আইল, কিংবা নদী খাল। কখনো আবার মাইলের, পর মাইল পার হন , রিকশা বা ভ্যানে করে। যেখানে গর্ভবতী মায়ের খোঁজ পান, সেখানে ছুটে যান। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীরা, যেখানে যান না সেখানে ছুটে যান।
এভাবে জীবন চলে। ছেলেরা বড় হতে থাকে। জীবন তাকে অনেক বঞ্চিত করেছে। তবু সে কর্মের প্রতি অটল।
তবে এই চলার পথে, তার মা তাকে অনেক সহযোগিতা করে । এতে তার সুবিধা হয়। মায়ের উপর নিশ্চিন্ত সংসারের দায়িত্ব দিয়ে, কাজে যেতে পারে।
সালমা তার নির্ধারিত ভিজিটের বাহিরে কখনো বকশিশ চাই না। এতে তার আত্মসম্মানে বাধে।
এতোক্ষণ আমরা জেনেছি, সালমার দুটো ছেলে আছে । কিন্তু না তার আরো একটি মেয়ে আছে। নাম ইমা। বয়স চার বছর। ছেলেদের থেকে ৮-১০ বছরের ছোট।
কে এই ইমা?
কি তার পরিচয়?
পরম যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে, কেন সালমা ইমাকে বড় করছে?
একটা ছোট্ট ফুট ফুটে শিশু, যখন চোখ মেলে পৃথিবীকে দেখে, তখন সালমা গভীর মমতা আর ভালোবাসায়, তাকে কোলে তুলে নেয়। এখন সে হাঁটি হাঁটি পা পা করে, সারা ঘর দৌড়ে বেড়ায়।।ঘড়ের কাজে এটা সেটা এনে সাহায্য করে। ফোন রিসিভ করেন। সে বাসায় ফিরলে দরজা খুলে দেয়। তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেয়। সালমা ও ইমার সব আবদার, হাসিমুখে পালন করে। ইমার ভবিষ্যতের জন্য, ব্যাংকে ডিপিএস খুলেছেন। সামনের বছর তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। ইমাকে তিনি আদর্শ স্কুল শিক্ষক বানাতে চান। যে সামান্য সম্পত্তি আছে, তার থেকে ইমার অংশ এখনই ঈমান নামে লিখে দিবেন। যাতে পরে কোন সমস্যা না হয়।
ইমার পরিচয় কি?
কে তার বাবা?
কোথায় তার বাড়ি?
একদিন সকালে সালমা ঘরের কাজে ব্যাস্ত। বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ঘর থেকে বের হলে, নিমিষেই গোসল হয়ে যাবে। তখন ফোন আসে।
সেই দ্রুত ঘরের কাজ শেষ করতে থাকে। এরপর হালকা খেয়ে মাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে, রওনা হয় অচিন গন্তব্যে। প্রথমে ছাতা মাথায় পায়ে হেঁটে এরপর নৌকায় করে, রোগীর বাড়ি হাজির হয়।
সদ্য মা হওয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীর বয়স মাত্র ১৬ বছর। বাল্য বিবাহের আইন ফাঁকি দিয়ে, ১৮ বছর বানিয়ে এই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়। অথচ মেডিকেল সায়েন্স অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু থাকে। আর সে কারণে সালমার মনে হয়, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮র একটু বেশি হলে আরো ভালো হয়। তবুও কেউ বিয়ে করে যদি পরিকল্পিত সংসার গঠন করে, তাহলে সমস্যা কম হবে। অন্তত বাচ্চা জন্মের ক্ষেত্রে, নিয়ম মেনে চললে, জীবন সুখের হবে।
সালমা রোগীর নাম রিপা। মজার ব্যাপার হলো, তার স্বামীর বয়স ৪৫ থেকে ৪৭ হবে। তিনি পূর্ব বিবাহিত, সেই ঘরে পাঁচটা সন্তান আছে। স্ত্রী মারা গেছে। তাই রিপা কে বিয়ে করেন। এভাবে এসব মানুষেরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে,অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর প্রভাব সারা বিশ্বের উপর পড়ছে। অর্থাৎ একটি শিশু জন্মের সাথে সাথে, পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের উপর, তার দায়িত্ব এসে পড়ে। ফলে পৃথিবী তার ভারসাম্য হারাচ্ছে, হয়ে যাচ্ছে দূষিত। করোনা ভাইরাস তার বড় প্রমাণ । কাঁপছে দেশ। কাঁপছে সারা বিশ্ব। আসলেই একের লাঠি দশের বোঝা।
রিপার স্বামীর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু তিনি জনসংখ্যা বৃদ্ধি করেই যাচ্ছেন। যা সমাজ দেশ ও বিশ্বের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সালমা পৌঁছাতে পৌঁছতে, রিপার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। সাধ্যমত চেষ্টা করো তাকে বাঁচানো যায় না। আর্থিক অনটনের কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়নি।
রিপা একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।
আর এই হলো ইমা। এই হলো ইমার পরিচয়। এভাবে সালমা ইমার মা হয়ে যায়। ইমার বাবা কোনদিন মেয়ের খোঁজ নেয়নি। হয়তো আবারো ১৫-১৬ বছরে, কিশোরী মেয়ে বিয়ে করে, নতুন সংসার করছে। হয়তো ভবিষ্যতের দরজায় আবারও কড়া নাড়ছে, একটি করুন মূত্যু।
যদি বাল্যবিবাহের পাশাপাশি, অসম বিয়ে বন্ধ করা হতো, তাহলে জনসংখ্যা যেমন হ্রাস পেতো, তেমনি অপমৃত্যু রোধ হতো। রিপার স্বামী যদি তার সমবয়সী মেয়ে বিয়ে করতো, তাহলে তিনি যেমন সুখে থাকতেন। তেমনি অন্যের কষ্ট ও কান্নার কারণ হতেন না।
এমনি ভাবে চলে চালমার জীবন চক্র । মানুষের পাশে থেকে, তাদের সেবা দেন ভালোবাসা দেন। কখনো কখনো হৃদয় পটে,কিছু মানুষ চিরদিনের জন্য থেকে যায়। ইচ্ছে করলে তাদের স্মৃতি সরানো যায় না। তারা হাসায় কাঁদায় যন্ত্রনা দেয় আনন্দ দেয়। কাউকে বাবা-মা, ভাই বোন মনে হয়। বিদায়ের যন্ত্রণা কখনো এতটা গভীর হয়, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়। মাঝেমধ্যে এই পেশা সালমার
আর ভালো লাগেনা। ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পরক্ষণে চোখের সামনে ভেসে উঠে করুণ মূত্যু। তখন আবার শুরু হয়, নতুন পথে, নতুন গন্তব্যে চলা।
আস্তে আস্তে জীবন প্রান্তে, সালমা বড় অসহায় হয়ে যায়। তার রোজকারে সংসারে তেমন অভাব না থাকলেও স্বামীর কারণে সংসারে সমস্যা দেখা দেয়। কারণ তিনি বারবার ব্যবসার মূলধন হারান। এতে প্রায় স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া হয়। এসব ঝগড়া সংসারে কম বেশি হয়। ঝগড়া বিবাদ হাসি কান্না আর ভালোবাসা সংসার কে করে, তুলে আরো মধুময় আনন্দময়। এভাবে জীবন বয়ে যাবে। আর সে বহমান জীবনে দাঁড়িয়ে, সালমা আগামী দিনের রঙ্গিন স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন রচনা করে।
একদিন তার সন্তানেরা বড় হবে। ছেলেদের বিয়ে দেবেন, বউ আসবে। তিনি শাশুড়ি হবেন। শরীর ভালো না থাকলে, আর দূরের কাজে যাবেন না। তারপর বৌদের উপর সংসারের দায়িত্ব দিয়ে, স্বামীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন, সোনার বাংলার আনাচে কানাচে।
সেদিন আর কতো দূরে?
তার স্বপ্ন সত্যি হবে?
আর কতো পথ পাড়ি দিতে হবে?
দিন যায় রাত আসে। মাস শেষ হয়ে বছর পূর্ণ হয়ে, নতুন বছরে ঘোষনা করে। বড় ছেলে ইন্টার শেষ করে, ছোট ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে। ইমার বয়স পাঁচ বছর। স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। নানি তাকে স্কুলে আনা নেওয়া করে। ইমা মাঝে মাঝে সালমার সাথে, রোগীর বাড়িতে যেয়ে হাজির হয়। সুখে দুখে দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিল। এভাবেই যদি সালমার জীবনের, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেটে যেতো, তাহলে কি এমন ক্ষতি হতো? না কোন ক্ষতি হতো না। কিন্তু মানুষ যা ভাবে তা হয় না, কিংবা কয় জনে পাই?
তারপর!
তারপর একদিন দুপুরবেলা, সালমার কাছে ফোন আসে। বলা হয় জরুরী ভাবে, তাকে যেতে হবে। রুগী ডেলিভারি ব্যথায় ছটফট করছে। বাহিরে তখন কালবৈশাখী ঝড়। এই ঝড়ে বের হওয়া মোটেও নিরাপদ না। কিন্তু তার পক্ষে না যাওয়া সম্ভব?চোখের সামনে নিমিষে, ভেসে উঠে রাবির করুন মূত্যু।
স্বামী ও মা দুজনেই বাধা দেয়। কিন্তু সব বন্ধন পিছনে পেলে, কালবৈশাখী ঝড়ে রাস্তায় নেমে যায় সালমা। রাস্তায় নেমে মনে হয়, ঝড় তাকেও উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
এতো কষ্ট ত্যাগ স্বীকার করে, যে মানব শিশুদের তারা ভূমিষ্ঠ করেন, বড় হয়ে সেই মিডওয়াইফ কে তারা চেনেন না।
শিক্ষক মানুষ করার কারিগর। তবে প্রশ্ন হল, নিরাপদ শিশুর জন্ম না হলে, শিক্ষক মানুষ করার জন্য কোথায় পেতেন? তাই শিক্ষকের পাশাপাশি, এরাও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে না? কিন্তু সমাজে এদের অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হয়। এটা কি ঠিক?
সালমাকে আবার রিপাদের গ্রামে যেতে হয়। সেখানে তিন দিন থাকতে হয়। সেই রওনা হওয়ার পরের দিন, তার মা তাকে ফোন করে বলে, তার স্বামী খুব অসুস্থ। সে যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে
কিন্তু সালমার কাছে কে বড়?
নতুন মা হতে যাওয়া রোগী?
না তার ২২ বছরের সঙ্গী স্বামী?
সে ভাবে চিকিৎসা পেলে স্বামী ভালো হয়ে যাবে । কিন্তু এই ২০ বছরের মেয়েটিকে ফেলে গেলে, হয়তো দুজনই মারা যাবে। অকালে ঝরে যাবে দুটো তাজা প্রান।
সালমা মাকে বলে স্বামীকে ভালো ডাক্তার দেখাও।
অবশেষে জয় হয় মানবতার। তিন দিনের দিন একটি ছেলে শিশুর আগমন ঘটে। আর সালমা বাড়ির পথে রওনা হয়।
বড় হয়ে এই শিশু হয়তো একদিন, অনেক বড় বিজ্ঞানী, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে। যাই হোক না কেন, ভালো মানুষ হলেই হলো। সৎ মানুষ হলেই হলো। কিন্তু সে সালমা নামের ধাত্রীকে চিনবে না। কখনো হয়তো জানবে না, তার জন্য সালমাকে, কতো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।
সালমা যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন সব শেষ। প্রিয় স্বামীর মুখ শেষবার দেখতেও পাইনা। কারণ এই গ্রামে লাশ রাখা সুবিধা নাই।
সালমার স্বামী আত্মহত্যা করে। সালমার বয়স এখন ৪২ বছর। এই বয়সে স্বামীর আত্মহত্যা, সমাজে কতোটা নিন্দিত, সেটা ভুক্তভোগী জানে। স্বামীকে হারিয়ে সেই দিশেহারা হয়। সুন্দর সালমার মুখে নেমে আসে বিষাদের ছায়া।
N
আগামীতে আরো কতো পথ পাড়ি দিতে হবে কে জানে? সেইভাবে তার ২২ বছরের বিবাহিত জীবনে, স্বামীকে সে কোন সুখ দেয়নি। যদি দিয়ে থাকে সেইটুকু সুখ নিয়ে আগামী দিন সে বেঁচে থাকতে পারত না?
আত্মহত্যা সেই মনেপ্রাণে ঘৃণা করে? আর সেই কাজটি তার ঘরে তার প্রিয়তম স্বামী করে !
সে এতো নিষ্ঠুর কেন?
এতো স্বার্থপর কেন?
সন্তানদের কথা একবারও ভাবলো না?-
নিজের কষ্ট দূর করতে যেয়ে কিছু মানুষ অন্যদের এমন চরম শাস্তি দিতে পারে?
প্রয়োজনে সে তাদের ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতো! তবুও এর থেকে অনেক ভালো হতো। এখন একদিকে পাহাড় সমান যন্ত্রণা, অন্যদিকে দায়িত্ব-কর্তব্য আর লোক নিন্দা।
এতো কিছু কিভাবে সামাল দেবে?
এখন লোকে আঙ্গুল উঠিয়ে বলবে, ওই সালমা তার কারণে, তার স্বামী আত্মহত্যা করেছে।
বাবার করুর মৃত্যু, সালমার ছোট ছেলে, সহ্য করতে পারে নাই। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। পাহাড়ের সমান অটল সালমা ভেঙ্গে পড়ে না। দক্ষ হাতে সমস্ত দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে যাই। আর শত কষ্টের মাঝেও রাতে ইমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়।
ইমা যখন আম্মু বলে ডাকে, তখন সালমার মনে হয়, সাগরের উপর থেকে, গভীর মমতায় কে যেন তাকে ডাকছে। তখন ইমাকে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে, সাগরের মত বিশাল মনের অধিকারী, মিডওয়াফই সালমা বলে,
টিয়া পাখি ঘুমাও!
কাল সকালে আবার স্কুলে যেতে হবে।
সালমার ছোট ছেলে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে ।
ছেলের একদিন বিয়ে করবে, মেয়েকে বিয়ে দিবে। আর সবাই মিলে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, তার পাশে থেকে ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখবে, এটাই আগামীর প্রত্যাশা।
সালমার পরিবারের জন্য শুভকামনা রইল।