আজ সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ || ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ সোমবার, ০৬:৫৫ অপরাহ্ন
সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬   |   sonalisandwip.com
নীলের ডাইরী থেকে.........আমি

II এ কে এম নুরুল আফসার (কাওসার) II

কাল বর্ষার বিয়ে। সারা বাড়ী নানান সাজে ঝলমল করছে। আত্নীয় স্বজনদের আনাগোনায়, ব্যাস্ততায় একটা ধুম ধাম রব চারিদিকে। প্রায় অর্ধ একরের ও বেশী এ বাড়ীর চারিদিকে টাংগানো হয়েছে নানান রং বেরং এর ঝুলবাতি। বাড়ীর কোন এক ঘর হতে বিস্মিল্লাহ খানের সানাইয়ের বিষাদময় আনন্দের সুর ভেসে আসছে। উৎসাহী স্বজনেরাও হাসী ঠাট্টায় কত রকমের কথায় হেসে গড়াগরী খাচ্ছে। রান্না ঘরে অতিরিক্ত চুলোর ব্যাবস্থা করা হয়েছে। চুলোতে চা এর পানি গরম হচ্ছে আর যার যখন ইচ্ছে তখনই চা এর কাপ হাতে এগীয়ে এসে চা বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ীর কাজের মানুষদের চোখে মুখেও ব্যাস্ততার মাঝে এক ধরনের উৎসবের আমেজ জড়িয়ে আছে বোঝা যায়।
বর্ষা তার বন্ধুদের নিয়ে বড় বারান্দাওলা ঘরে নানান সাজে ও গল্পে ব্যাস্ত। বন্ধুদের নানান রসিকতায় কখনো তার নাক, মুখ , কান লাজ রাংগা লাল হয়ে উঠছে।আজকালকার মেয়েরাও যা হয়েছে না! তাদের মুখে কিছুই আটকায় না।সম্ভব অসম্ভব সবই অকাতরে বলে ফেলে আনন্দ পায়। বলবেই বা না কেন! দু'শ বছরের এগীয়ে থাকা দেশের সংস্কৃতিতে বড় হওয়া মেয়ে ওরা।লম্বা ঘোমটা দেয়া লুকোচুরি ভালোবাসায় ওদের বেড়ে ওঠা নয়। সুতরাং, ওরা তো ওদের মতই দুর্দান্ত যৌবনের উন্মাদনায় নিজস্বতাকে প্রকাশ করবেই। কোন দোষ নেই এতে ওদের।বর্ষার ঘরেও বাজছে প্রেমের গান! করুক। ওরা আজ মন ভরা আনন্দে মেতে থাকুক।আজ ওদেরই সখসখীময় আনন্দের দিন। কাল তো আনুষ্ঠানিকতায় কেটে যাবে। মেয়েটা চলে যাবে তার নিজস্ব জীবনে। ভাবতেই কেমন করে উঠলো মনটা। হুহু করে উঠলো বুকের ভেতরে।মেয়েটা চলে যাবে। তার সমস্ত শিশুময় আবদার, কিশোরী শংকা, যৌবনের ঝিলিকময় আনন্দ উন্মেষের প্রকাশ যে মা কে সে অকাতরে বলতো, সেই মেয়েটি কাল অন্য ঘরে চলে যাবে। অন্য কারো নিবির আলিঙ্গনের সুখে বিভোর হবে। এই ই নিয়ম। এমনি করেই একদিন অনেক প্রেম , অনেক শংকা, অনেক প্রতীক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে আমিও আমার মায়ের কাছ থেকে বর্ষার বাবার কাছে সমর্পিত হয়েছিলাম।সেদিন মায়ের চোখ মুখের যে আকুতি দেখেছিলাম, আজ নিজে মা হয়ে আমার যে অনুভুতি হচ্ছে বর্ষা কি সেই অনুভবের আকুতি বুঝতে পারছে? নানান ব্যাস্ততার কারনে তার কাছাকাছি যাওয়া হয়নি আমার। দু'একবার চোখা চোখি হতেই মন কেমন করে উঠেছিলো। আমি অভয়ের হাসি বিনিময় করে সরে গিয়েছি। তাকে বুঝতে দিই নি আমার কষ্ট হচ্ছে। নতুন জীবনে আমার মেয়ে আমার কষ্ট মাখা মূখ খানা না দেখুক এই আমি চাই। তাই অকারনে নিজেকে আড়াল করেছি বার বার।
বর্ষার সাত বছরের ছোট বন্যা। বন্যা সতেরতে পড়েছে এই সেদিন। আপুর বিয়ের আয়োজনে তারও আনন্দের সীমা নেই। ঘর সাজানো, পোশাক নির্বাচন, জুয়েলারী প্রসাধনী কেনা, সব কিছুতেই তার ভীষন উৎসাহ। নিজের সাজ পোশাকেও তার ভীষন সচেতনতা। বন্যা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে নিজেও বেশ মজে আছে। থাকুক। আমার এই ছোট্ট মিনি মিনি পুষি পুষি মেয়েটা, বন্যা যার নাম, নিজের আনন্দে ভালোবাসায় মেতে থাকুক। অমন দিনের প্রতীক্ষা আমার সারা জীবনের।
ওদের বাবা ও আজ ভীষন ব্যাস্ত। তার ব্যাস্ত থাকারই কথা। বিশাল ধনাঢ্য,জমিদার পরিবারের সন্তান সে। রক্তে বইছে বংশের রাজধারা। তার জীবন বোধই আলাদা। অসাধারন প্রাণবন্ত এ মানুষটি সবারই মধ্যমনি সারাজীবন। নিজের priority যে মানুষ ধারন করতে পারে এবং সেই priorities এ অটল ও অবিচল থাকতে পারে সেই সফলতার শীর্ষে অবস্থান করে। এই ই জাগতিক স্বীকৃত নিয়ম।বর্ষার বাবাও সে ধরনের চিত্তের একজন বিলাসী মানুষ। আজ তার বড় মেয়ের বিয়ে। তার আনন্দের সীমা নেই। সব ধরনের উৎকন্ঠাকে ধারন করে নিজেকে উজাড় করে চন্চল ভাবে কাজ করে চলেছে মানুষটা। অনেক প্রাণ শক্তি তার। সর্বক্ষনই ব্যাস্ত সে। মুঠো ফোনে, ল্যান্ড ফোনে স্বজনদের সাথে আলাপচারিতায় সর্বত্রই তার উপস্থিতি। দু'একবার আমার কাছে এসেও এ জিনিস ও জিনিস জানতে চেয়েছে।আমি হাসি মুখে জবাব দিয়েছি। তার একটাই কথা, আমার বর্ষার বিয়ে, ধুমধাম আনন্দের সাথেই হতে হবে।খরচের কোন বালাই থাকবে না।
থাকুক। এ মানুষটিও তার সহজাত আচরনের সৌন্দর্য্যে আনন্দের ব্যাস্ততায় ডুবে থাকুক। তার সকল উৎসাহ ও আশা পূর্ন হোক। আমি বিধাতার কাছে এই প্রার্থনা করি। বার্ধক্য জনিত অসুস্থতার কারনে তার দাদা দাদি আসতে পারেনি ।কিন্তু অনেক দোয়া ও আশীর্বাদ পাঠিয়েছেন। দুর দেশ হতে। নিয়মিত খবর নিচ্ছেন। পরামর্শ দিচ্ছেন তাদের সন্তানকে।বর্ষার বাবাকে। আমাকেও  অনেক উপদেশ দিয়েছেন তারা। আমি অনুভব করেছি তাদের আশীর্বাদ।
এভাবেই সমস্ত দিন শেষে বিকেল চলে গিয়ে কখন এশার নামাজ পড়ে আমি রাতের খাবার হাতে আমার একান্ত কোনে এসে বসি। মনটা কোথায় যেন পড়ে আছে। ঠিক যেন বুঝতে পারছি না। সামান্য ভাত, সব্জি , ডাল আর সালাদ দিয়ে রাতের খাবার শেষ করি। কিন্তু, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না , এক ধরনের একাকীত্ব অনুভব করছি। আমার আজ বিশেষ একটি দিন, কাল আমার বড় মেয়ের বিয়ে।সব ঠিক ঠাক মতই চলছে। কোথাও কোন ব্যাত্যয় ঘটেনি। কিন্তু আমারই হৃদয়ের একান্ত কোনে একধরনের ভিন্নতর বাজনা অনুভব করতে পারছি আমি। একাকীত্ব প্রয়োজন আমার। আমি কফির মগ হাতে নিয়ে দোতালা বাড়ীর ছাদে উঠে আসি। ছাদের এক কোনে এসে আকাশের দিকে দেখি।চারিদিকে শুনশান নিরবতা। নীচের কোলাহল এখানে খুব একটা আসছে না। খোলা আকাশের নীচে কফির মগ হাতে আমি হেঁটে বেড়াই । আমার ভীষন কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কি কথা? সারাদিনই তো কথা বলেছি। এ কথা ও কথা , সংসারের রাজ্যের কথা। তবুও আমার , আমার কথা বলা হয়নি মনে হচ্ছে। আমার এখানে এই শহর থেকে কিছুটা দুরের বাড়ীর ছাদে হেঁটে হেঁটে বুকের ভেতর থেকে এক ধরনের হাহাকারের মিষ্টি কষ্ট বের হয়ে আসতে চাইছে। মনটা বার বার সুদুরের কোন ভূবন ডাংগায় চলে যাচ্ছে। সেথায় একাকী হেঁটে বেড়াচ্ছে কেউ একজন। পাগল পন। গান করছে উচ্চ স্বরে, কোন রাখ ঢাক নেই, নেই কোন আভিজাতে্যর তোয়াক্কা। শিষ দিয়ে উঠছে আপন মনে। ভোরের নরম আলোয় দিনের প্রথম সুর্য উঠা দেখে বলে উঠছে" হাঁসের ডিমের কুসুমের মত সূর্য"।
আহারে।
আমি আকাশের পানে চেয়ে থাকি। অনেক দুরে তারাদের দেখি। 
কোন একদিন সেই কৃষ্নকান্ত ছেলেটি আমায় তারা দেখা শিখিয়েছিলো। 
বলেছিলো, "আমার ভীনদেশী তারা"....
আজকের মতই আমার ভীনদেশী তারা। 
সে একা! 
রাতের এই আকাশে!

সেই থেকে কেটে গেছে বহুদিন, বহু সন্ধ্যা, বহু সকাল...
নিয়তি আমাদের বিচ্ছিন্ন করেছে। 
নিয়তির কাছে মনের অন্তস্থল থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রার্থনাই হয়তোবা ছিলো! 
একদিন সন্ধ্যায় অমনি পথচলাতে আনমনা সেই যুবক দুর্ঘটনায় পতিত হয়!
তবুও আনমনা যুবক তার ব্যাথার কষ্টের চেয়েও ভাবে বেশতো হলো,নীলা তো জানলো না!
প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে ভাবে মনের কষ্টের সাথে আরো কিছু যোগ হলো না হয়!
জীবন চলে তার নিজের গতিতে! 
নীলার জীবনে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে তো সে মুক্ত!
আমি স্টিক হাতে ভর করে নিত্যকার জীবন করি!
আমাকে আদর করে এক লোকমা খাবার দেবে অমন মানুষ কই!
নীলা হয়তো জানবে না একদিন যে মানুষটা তার জন্য বহুবার দুর্ঘটনায় পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিলো 
সেই মানুষটাই আজ সত্যিকারের দুর্ঘটনায় খুড়িয়ে হাটে!
প্রতিটা মুহুর্ত তাকে ভাবে.. 
তবুও সে ভালো অাছে এই ভেবে সাময়িক সান্তনা খোঁজে! 
বড়ই অদ্ভুত এ ভালোবাসা...
বড়ই অদ্ভুত এ মমতা...
নীলা সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকুক, আনন্দে ভরপুর থাকুক!
আমার দুঃখি জীবন তাকে ছোঁবে না!
সে অনেক বুদ্ধিমান! 
বুদ্ধির কাঠাল!
কেউ জানবে না গহীন গোপন প্রণয়ের কষ্ট! 
বন্যা, বর্ষা, তাদের বাবা,পরিবার, সমাজ ইত্যাদি... 
সে সুন্দর করে সাজবে,
সামাজিকতায় রূপকথার রাজকন্যা হয়ে থাকবে! 
বড়ই আনন্দে আমার ও মন ভরে থাকবে! 
একটাই জীবন আমাদের! 
আমাকে ভালোবেসে নীলা সব হারাবে এ চাওয়া ছিলো না আমার কখনো।
বলেছিলাম
আমি যেমন তেমন, 
তুমি ভালো থেকো গো 
"সোনার মেয়ে "
"আমার ভীনদেশী তারা "....