আজ শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫ || ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন
সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০২৫   |   sonalisandwip.com

অ্যাডভোকেট বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া ::

প্রখ্যাত স্বপ্ন বিশারদ আলেমেদ্বীন মোহাদ্দেস  হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহ (রাহিঃ)। উনার বাড়ি সন্দ্বীপ কালাপানিয়াতে। উনি আমার ওস্তাদ ছিলেন। উনি অনেক মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও মুহাতামাম ছিলেন। আমার পিতামহের ২২ শতক দানকৃত মনসুর আলী ভূঁইয়ার পুকুরের উত্তর পাড়ে জায়গার উপর  মাহমুদিয়া হুসাইনিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করেন।

উনি আমার পিতামহ ও বাবার শ্রদ্ধাভাজন ও আস্থাভাজন একজন ব্যক্তি ছিলেন। উনি ছিলেন সন্দ্বীপে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও স্বপ্ন বিশারদ। উনি যখন আমাদের বাড়ির দরজায় মাদ্রাসা স্থাপন করেন তখন আমি প্রাইমারির গন্ডি পেরিয়েছি। সে মাদ্রাসায় সকালে মক্তব ও ছিল। সকালে মক্তব তালিম দেওয়ার জন্য দুইজন কারী সাবও ছিলেন।

মুহাতামেম সাহেব ও সকাল বেলা মুক্তবে পড়াতেন। উনারা অতি সহি শুদ্ধভাবে কোরআন পড়াতেন। আমি সহ আমাদের বাড়ির অনেকেই আরো তিন চার বৎসর পূর্বে কালাপানিয়া মাদ্রাসার মক্তবে কোরআন শিক্ষা শেষ করেছি। বিধিবাম বড় হুজুরের অর্থাৎ মুহতামাম সাহেবের মতে আমাদের কোরআন শিক্ষা সহি শুদ্ধভাবে হয়নি। আমরা ও সহি শুদ্ধভাবে কোরআন শিক্ষার জন্য পুনরায় মক্তবে ভর্তি হলাম।

আমাদের কয়েকজনকে পড়াইতেন মুহতারাম সাহেব নিজেই। উনার বড় ছেলে কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী ও আমাদের সাথে পড়তো। সে আমার কয়েক বছরের ছোট ছিল। আশেপাশের এলাকা থেকে সকালবেলা মক্তব পরিপূর্ণ হয়ে যেত।

মক্তব ছুটির পর বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়ার পর পুনরায় এসে মাদ্রাসায় পড়তাম। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে মেঘনা নদীর দ্রুত ভাঙ্গনে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। আমিও পরের বছর উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে যাই।

আমার বাবা মার ইচ্ছা অনুযায়ী আমার আর আলেম হওয়া হলো না। মাদ্রাসায় পড়াকালীন সময়ে আমার একখানা পাসপোর্ট সাইজের ছবির প্রয়োজন হয়ে পড়ল। ছবি তোলার জন্য ওস্তাদজি আমাকে সাথে করে সন্দ্বীপ টাউনে নিয়ে গেলেন। উনি ছিলেন খুব ভোজন রশিক অতিথি পরায়ণ ব্যক্তি বিশাল মনের অধিকারী।

উনি সব সময় মানুষকে খাওয়ায়ে আনন্দ পেতেন। নিজের লাভালাভের কখনো হিসাব করতেন না। সন্দ্বীপ টাউনে পৌঁছে উনি প্রথমে ঢুকলেন হোটেলে। হোটেলে ভুরিভোজের পরে গেলেন ঝিনুক স্টুডিও তে। ওস্তাদজীকে দেখে স্টুডিওর মালিক নিজে ছুটে আসলেন।

ওস্তাদজি আমার পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলে দেয়ার জন্য বললেন। টেকনিশিয়ান যখন আমার ছবি তুলছেন তখন ওস্তাদজি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওস্তাদি তখন ওনার জারন খানা অর্থাৎ হুজুরি রুমাল আমার কাধের উপর পরম যত্নে বসিয়ে দিলেন। সেই ছবি খানা অদ্যাবধি আমার স্বযত্নে আছে।

উনি ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী উচ্চ বিলাসী ব্যাক্তি।উনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাঠ চুকিয়ে চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা প্রতিষ্ঠা করলেন আল গনি মিশনারি দাওয়াখানা। উনি কোরআন হাদিস দিয়ে বিভিন্ন রোগের মানুষের চিকিৎসা করতেন। তখন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি উনার চিকিৎসা নিতে আসতেন।

আমিও ১৯৮৬ ইং এস এস সি পাস করার পর শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহরে কলেজে ভর্তি হই। এক সময় চট্টগ্রাম শহরে আমার থাকার সমস্যা হয়। শহরে আমার জ্যাঠা ও মামার বাসা ছিল আমি তাদের বাসায় না গিয়ে ওস্তাদির কাছে গেলাম। গিয়ে দেখলাম সেখানে এলাহি কান্ড।১০-১৫ জন ওনার আশ্রয়ে আশ্রিত আছে। উনি দুহাতে প্রচুর টাকা উপার্জন করছেন সেভাবে প্রচুর খরচও করছেন । আমাকে উনি সেখানে না রেখে ওনার ছেলে মাহমুদের সাথে ওনার আমান বাজার ভাড়া বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। মাহমুদের মা-বোনেরা ছিল প্রর্দানশীল উনারা কাউকে দেখা দিতেন না।

আমার বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হলো না। ছোটবেলায় ও আমি অনেকবার ওনাদের বাড়িতে গিয়েছি তখনও ওনারা আমাকে দেখা দিতেন না। তবে কিছু না খাওয়াই বিদায় করতেন না। তখন আমাকে ওনারা যে আদর আপ্যায়ন করছেন তা আমার মনের মনি কোঠায় এক অবস্মরনীয় ঘটনা হয়ে উজ্জ্বল তারার মতো ঝলমল হয়ে অদ্যাবধি বিরাজ করছে।

কয়েকদিন সেখানে থেকে মাহমুদ সহ আন্দরকিল্লা ফেরত আসলাম। তারপর একখানা লজিন ঠিক করে আমি লজিনে চলে গেলাম।

আমি যথারীতি ১৯৮৮ ইং তে এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ করলাম। তখন আমি একখানা বিষ্ময়কর স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের অর্থ জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলাম। হঠাৎ করে আমার ওস্তাদজির কথা মনে পড়লো।

উনি আমার আব্বার অনেক স্বপ্নের তাবির করেছেন তা তীরের মত দ্রুত বাস্তবে ফলেছে। আমি দ্রুত ওস্তাদজির কাছে আন্দরকিল্লায় চলে গেলাম। উনি আমার স্বপ্ন শুনে উজ্জ্বল হাসিতে ফেটে পড়লেন আর বললেন তোমার বিমানে চাকরি হবে।

উনি তৎক্ষণাৎ ১০০ টাকার একখানা নোট বের করে একজনকে বললেন আমার ভাইপোর বিমানে চাকরি হয়েছে তাড়াতাড়ি মিষ্টি নিয়ে আসো।আমি এ ঘটনায় বিহবল। কারণ তখনও আমি চাকরি-বাকরির কথা চিন্তা করি নাই।

কয়েকদিন পর আমি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দেয় এবং পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হই। অতঃপর ১৮৮৯ ইং সালে আমি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগদান করি। ওস্তাদজির স্বপ্নের তাবির তীরের মত আমার জীবনে ফলপ্রসূ হয়েছে। ২০০৭ সালে আমি বিমান বাহিনী হতে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করলাম।

পরবর্তীতে আমি আরেকটি বিষয়ের স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নের অর্থ জানার জন্য ব্যাকুল হলাম তখন ওস্তাদজীর কথা মনে পড়লো। তখন উনি কাউখালী নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। উনার কোন মোবাইল নম্বর আমার কাছে নাই।

আমি ওনার ছেলে মাহমুদকে রিং করলাম উনার নাম্বারের জন্য। মাহমুদ বলল ভাইয়া কি জন্য। আমি বললাম আমার একখানা স্বপ্নের তাবিরের জন্য ওনাকে প্রয়োজন। মাহমুদ বলল ওনার তো এখন সেই স্মরণশক্তি নাই আপনাকে স্বপ্নের তাবির বলার মত। আমি বললাম তুমি ওস্তাদজীর নাম্বার দাও আমি ওনার সাথে কথা বলবো।

মাহমুদ যথারীতি আমাকে ওনার নাম্বার দিল। আমি তখন পতেঙ্গায় থাকি। আমি ওস্তাদজির কাছে রিং করলাম। উনি মোবাইল কল ধরলেন। আমি আমার পরিচয় দিলাম উনি আমাকে বুঝতে অসুবিধা হলো আমার আব্বার নাম বললাম।

উনি সাথে সাথে কেঁদে দিলেন, অনেকক্ষণ কাঁদলেন। উনি শান্ত হলে আমার উদ্দেশ্যের কথা বললাম। উনি স্বপ্ন শুনলেন আর ব্যাখ্যা করলেন স্পষ্ট বাংলায় “তোমার পারিবারিক বিশৃঙ্খলা তোমার দ্বারা নিরসন হবে ।

তোমার পারিবারিক বিশৃঙ্খলা তোমার দ্বারা নিরসন হবে এবং তোমার পরিবার তোমার পরিচয়ে পরিচিত হবে। এবারও ওনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমার জীবনে তীরের মত ফলফসূ হল।

উনার মৃত্যুর পর আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য আমি বিভিন্ন আলেম-ওলামাইয়ের কাছে গিয়েছি কিন্তু এভাবে অথেন্টিক স্বপ্নের ব্যাখ্যা পাইনি। উনি দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পড়েন। সন্দ্বীপের মাওলানা কলিমুল্লাহ সাহেবও বাংলাদেশের বিখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা ইদ্রিস সাহেব ওনার ক্লাসমেট ছিলেন। উনি অত্যন্ত তুখোড় মেধাবী ছাত্র ছিলেন।

১৯৯৪ সালে আন্দরকিল্লায় উনার প্রতিষ্ঠিত আল গনি মিশনারী দাওয়াখানায় একটি মসলা জানার জন্য উনার কাছে যাই। মসলাটা হলো এই হযরত মুয়াবিয়া রাঃ সম্পর্কে “হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলামের ইতিহাসে ওনার সম্পর্কে ইসলামবিদ্বেষী অনেক ঘটনা রয়েছে। তাহলে কি ওনার নামের পরে রাঃ বলতে হবে? আমার কথা শুনে উনি অগ্নিসর্ম্ম হয়ে গেলেন।

সাহাবী সম্পর্কে এমন কটু কথা কখনো বলবে না। তৎক্ষণাৎ তাক থেকে কোরআন শরীফ বের করে পড়লেন আর বললেন। দেখো কোরআনে সাহাবী সম্পর্কে আল্লাহ পাক কি ঘোষণা করছেন। তার অর্থ বললেন। সেই অর্থ আজ আমার স্মরণে নেই কিন্তু সারমর্ম অর্থ এই সাহাবীর সম্পর্কে কখনো কটু কথা বলা যাবে না। আল্লাহ পাক উনাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুক।

আমিন।